বুধবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৩

বরিশাল


ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল। বরিশালকে নিয়ে এই প্রবাদের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় সেখানে গেলে। কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত বরিশালের পূর্ব নাম ছিল চন্দ্রদ্বীপ। প্রায় ২৭৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জেলার উত্তরে মাদারীপুর, শরিয়তপুর ও চাঁদপুর জেলা, দক্ষিণে পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি জেলা, পূর্বে ভোলা ও লক্ষ্মীপুর জেলা এবং পশ্চিমে ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও গোপালগঞ্জ জেলা। কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা ইত্যাদি জেলার প্রধান নদী। বরিশাল জেলার বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ নিয়ে কড়চার এবারের বেড়ানো। প্রাচ্যের ভেনিস বরিশাল দক্ষিণাঞ্চলে অসংখ্য পুরাকীর্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই ছিল দেব-দেবীর মূর্তি, দীঘি, দুর্গ, তাম্রলিপি ও মুদ্রা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাকলা-চন্দ দ্বীপের অনেক পুরনো কীর্তিই ধবংস হয়ে গেছে ঘূর্ণিঝড় ও নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, চতুর্থ শতকে রাজা চন্দ বরমা চন্দ দ্বীপ জয় করে একটি বিরাট দুর্গ নির্মাণ করেন। এই দুর্গটির অবস্থান ছিল কোটালীপাড়ায়। মাটির দুর্গটি ১৫ থেকে ৩০ ফুট উঁচু এবং দুই মাইল লম্বা। ৩১৫ খ্রীষ্টাব্দে এটি নির্মাণ করা হয়। ১৫০৮ খ্রীষ্টাব্দে ভূমি জরিপের সময় কোটালীপাড়ায় ঐ দুর্গের কাছাকাছি বেশকিছু স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যায়। এছাড়া বেশকিছু তাম্রলিপি উদ্ধার হয়। তাম্রলিপিগুলোর মধ্যে ঘুঘ্রাহাটি বা ঘাগরকাঠি তাম্রশাসন তাৎপর্যপূর্ণ। ষষ্ঠ শতকে চন্দ দ্বীপ-বাকলার দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ ছিল সমৃদ্ধশালী জনপদ। দশম শতকের রাজা শ্রী চন্দে র ৫ খানা তাম্রশাসনের মধ্যে তিনখানা প্রাচীন চন্দ দ্বীপে পাওয়া যায়। এগুলো হলো ধুলিয়া, কেদারপুর ও ইদিলপুর তাম্রশাসন। ধুলিয়া ও কেদারপুর বর্তমানে ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত। আর কোটালীপাড়া গোপালগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। এছাড়া উজিরপুর থানার শিকারপুরে ১০১৫ খ্রীষ্টাব্দে রচিত একটি তালপাতার পুঁথি পাওয়া যায়। তাম্রশাসনে গৌরনদী থানার রামসিদ্দি, বাঙ্গালা ও ঝালকাঠী থানার নৈকাঠী ও চন্দ দ্বীপের নাম উল্লেখ ছিল। রামসিদ্দি ও বাঙ্গালা গ্রাম দুইটি ছিল পাশাপাশি। ১৩ শতকের এ তাম্রশাসনে ব্রাহ্মণকে ভূমিদানের ও চন্দ ভণ্ড জাতি শাসন ও মন্দির নির্মাণের কথা উল্লেখ আছে। চতুর্থ থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত বাকলা-চন্দ দ্বীপে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে। তখন সংঘারাম বৌদ্ধ মন্দির ও বেশ কিছু বৌদ্ধ মন্দির স্থাপিত হয়। মূলত পাল ও সেন আমলে চন্দ দ্বীপ (বরিশালের আদি নাম) উন্নত জনপদ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। তখন বাঙ্গালা, রামসিদ্দি, মাহিলারা, ফুলশ্রী, গোবরধন, বাটাজোর, চন্দ হার, শিকারপুর, বাগদা, নলচিড়া, বাকাল, বাকাই, লক্ষণকাঠী, আগৈলঝাড়া, নৈকাঠী, রুনশি, বাইশারী, নথুল্লাবাদ, রাজাপুর, ইদিলপুর, গোবিন্দপুর ও লতা প্রসিদ্ধ স্থান হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। এই স্থানগুলোতেই ছিল নানা প্রাচীন কীর্তি। কালের বিবর্তনে পুরনো কীর্তি তো দূরের কথা, অনেক এলাকার অস্তিত্বই নেই। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ছাড়াও নদী ভাঙ্গনে হারিয়ে গেছে এসব পুরাকীর্তি। এক সময়ে যেখানে ছিল রাজাদের দালানকোঠা, সেখান দিয়ে এখন চলছে বড় বড় জাহাজ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ফুলশ্রী গ্রামে রাজবংশের ৭ জন রাজকুমারের নামে ৭টি দীঘি ছিল। সুপরিকল্পিতভাবে সুপেয় পানির জন্য খনন করা হয়েছিল এ দীঘিগুলো। এখন তার অস্তিত্ব নেই। অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। নরসিংহের দীঘিতে ঘাটলা পাওয়া গিয়েছিল স্বাধীনতার আগে। এখন সেখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। মাহিলাড়ার রুদ্র সেনের বাড়ি ও দীঘি এখন শুধুই ইতিহাস। রাজাপুর থানার নিকট স্বাধীনতার পূর্বে পুকুর খনন করতে গিয়ে মাটির নীচে টালী ইটের নির্মিত প্রশস্ত দেয়াল পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদগণের মতে এসব স্থাপনা সেন আমলের তৈরি। পাল ও সেন আমলের মূর্তিগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ধবংস হয়ে গেছে। চুরি হয়ে গেছে অনেক পুরাকীর্তি। মাধবপাশার দলুজমর্দন সুগন্ধা নদীতে কাইত্তাইনি মূর্তি পেয়েছিল। দুইটি মূর্তি মাধবপাশার রাজবাড়িতে রাখা হয়েছিল। রাজপরিবার ৫শ’ বছর ধরে ঐ মূর্তি পূজা করত বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। এখন মূর্তিও নেই রাজা কিংবা রাজ্যও নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঐ মূর্তি দুইটি উধাও হয়ে যায়। পরবর্তীতে পুলিশ একটি মূর্তি উদ্ধার করে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে পাঠায়। শিকারপুর থেকে উদ্ধার করা তারা মূর্তিটি ছিল ভারতবিখ্যাত। তখন ঐ মূর্তিকে কেন্দ করে শিকারপুর তীর্থ স্থানে পরিণত হয়েছিল। দেবীর সেবায়েতের নিজ হাতে লেখা প্রাচীন পুঁথি থেকে জানা যায়, শ্রী গঙ্গাবতী চক্রবর্তী সুগন্ধা নদীতটে পাষাণময়ী তারামূর্তি ও শিবলিঙ্গ প্রাপ্ত হন। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে আটিপাড়া গ্রামের একদল মুসলমান ঐ মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলে। পরে সেখানে একটি কালি মূর্তি স্থাপন করা হয়। সেই মূর্তিটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ভেঙ্গে ফেলে। মূর্তির সাথে প্রাপ্ত শিবলিঙ্গ তারা মন্দিরে এখনো সংরক্ষিত আছে। শিকারপুরে ধবংসপ্রাপ্ত তারা মূর্তিটি সপ্তম শতকে স্থাপন করা হয়েছিল বলে সেবায়েতরা দাবি করেন। দক্ষিণাঞ্চলের বহু পুরনো মূর্তি, মন্দির ও পুরনো মুদ্রা এভাবেই বিলীন হয়েছে। প্রাচীন বাড়িগুলো বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে। এখন প্রততত্ত্ব অধিদপ্তর যেসব পুরাকীর্তি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছে তা ততটা পুরনো আমলের নয়। কীর্তনখোলা নদী : বরিশাল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কীর্তনখোলা নদী। বরিশালের সায়েস্তাবাদ থেকে শুরু হয়ে নদীটি গাবখান খালের কাছে এসে গজালিয়া নদীতে পড়েছে। বর্তমানে এটি বরিশাল নদী নামেও পরিচিত। অশ্বিনীকুমার টাউন হল : বরিশাল শহরের সদর রোডে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী অশ্বিনীকুমার টাউনহল। বরিশাল শহরের উন্নয়নের প্রাণপুরুষ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অশ্বিনীকুমার দত্তের নামানুসারে এ হলের নামকরণ করা হয়। এ হলটি প্রতিষ্ঠার পেছনে আছে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯০৬ সালে রাজা বাহাদুরের হাবেলিতে মিছিলের উপর পুলিশ হামলা চালায়। এ ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে অশ্বিনীকুমার দত্ত একটি হল নির্মাণের প্রস্তাব করেন। ১৯২০ সালে অশ্বিনীকুমারকে সভাপতি ও শরৎচন্দ্র গুহকে সম্পাদক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। একই বছর রাজা বাহাদুরের হাবেলির মালিকদের নিকট থেকে জমিও ক্রয় করা হয়। পরের বছর হলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৩০ সালে। এর মাঝে ১৯২৩ সালে অশ্বিনীকুমার দত্তের মৃতু্য হলে এক শোকসভায় সর্বসম্মতিক্রমে হলটি তার নামে নামকরণ করা হয়। বিএম কলেজ : বরিশালের প্রাচীন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্রজ মোহন কলেজ। ১৮৮৪ সালের ২৭ জুন এই কলেজ স্থাপিত হয়। অক্সফোর্ড মিশন গির্জা : শহরের বগুড়া রোডে রয়েছে সুরম্য স্থাপনা সমৃদ্ধ অক্সফোর্ড মিশন গির্জা। এখানকার গির্জাটি বেশ আকর্ষণীয়। গ্রিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত গির্জাটির ভেতর আছে সুবিশাল প্রার্থনা কক্ষ। মুকুন্দ দাসের কালিবাড়ী :শহরের পাশেই রয়েছে চারণকবি মুকুন্দ দাসের বসতভিটা। কবির জন্ম বিক্রমপুরে হলেও তার পিতা গুরুদয়াল বরিশালের আদালতে আরদালির কাজ করতেন। সেই সূত্রে তারা বরিশালের বাসিন্দা হন। কড়াপুর মিঞাবাড়ী মসজিদ : জেলার সদর উপজেলার কড়াপুর ইউনিয়নের মিঞাবাড়ীতে রয়েছে প্রাচীন একটি মসজিদ। একটি উঁচু ঢিবির উপরে নির্মিত এ মসিজদে ওঠার জন্য সামনের দিকে ঠিক মাঝখানে একটি সিঁড়ি আছে। সামনের দেয়ালের তিনটি প্রবেশপথ বরাবর পশ্চিম দেয়ালে আছে তিনটি মিহরাব। মসজিদের উপরে আছে তিনটি গম্বুজ। মসজিদের সামনের দেয়ালে আছে চারটি মিনার এবং এগুলোর ফাঁকে ফাঁকে আছে অপেক্ষাকৃত ছোট আরো ছয়টি সরু মিনার। ধারণা করা হয়, মসজিদটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত। দুর্গাসাগর : বরিশাল শহর থেকে প্রায় এগারো কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মাধবপাশা গ্রামে ছিল বাকলা চন্দ্রদ্বীপ রাজাদের আবাসস্থল। তারা পটুয়াখালী জেলার বাউফল থেকে মগ জলদসু্যদের ভয়ে কিংবা নদী ভাঙ্গনের ফলে এখানে চলে আসেন বলে জানা যায়। এখানে রাজাদের প্রাসাদ, মন্দির ইত্যাদির ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান। তবে মাধবপাশার দর্শনীয় স্থান হলো প্রাচীন দীঘি দুগর্াসাগর। রাজা জয়নারায়ণের মা দুর্গাদেবীর নামে এর নামকরণ করা হয়। বিশাল এ জলাশয়ের ঠিক মাঝখানে আছে একটি ছোট্ট দ্বীপ। শীতে এ দ্বীপে প্রচুর অতিথি পাখির সমাগম হয়। বরিশালের নথুলস্নাবাদ বাস স্টেশন থেকে বানারীপাড়ার বাসে সহজেই আসা যায় দুর্গা সাগর। বায়তুল আমান মসজিদ : জেলা সদর থেকে প্রায় পনের কিলোমিটার দূরে বরিশাল-বানারীপাড়া সড়কের পাশে গুঠিয়া এলাকায় রয়েছে আধুনিক স্থাপত্যরীতিতে তৈরি বায়তুল আমান জামে মসজিদ। স্থানীয়রা একে গুঠিয়া মসজিদও বলে থাকেন। বিস্তীর্ণ খোলা চত্বরের মাঝে বিশাল এ মসজিদটির কেন্দ্রে রয়েছে কারুকাজ খচিত একটি গম্বুজ। মসজিদের উঁচু মিনারটিও বেশ আকর্ষণীয়। এটি বাংলাদেশের আকর্ষণীয় মসজিদগুলোর একটি। গুঠিয়ার সন্দেশ : গুঠিয়ার আরেক বিশেষ আকর্ষণ এখানকার সন্দেশ। গরুর দুধের ছানা দিয়ে তৈরি এ সন্দেশ খুবই মজাদার। গুঠিয়া মসজিদের পাশেই পাওয়া যায় এ সন্দেশ। প্রতিটি সন্দেশ বিক্রি হয় সাত টাকায়, আর প্রতি কেজি ৩০০ টাকায়। শেরে বাংলা স্মৃতি জাদুঘর : বরিশাল সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে বানারীপাড়ার চাখারে অবস্থিত শেরে বাংলা স্মৃতি জাদুঘর। ১৯৮২ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে এ জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করে। এ জাদুঘরে দেখা মিলবে শেরে বাংলার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের দুর্লভ সব আলোকচিত্র, তার ব্যবহূত নানান আসবাবপত্র ইত্যাদি। জাদুঘরের অদূরেই রয়েছে ১৯২৯ সালে শেরে বাংলা কতর্ৃক প্রতিষ্ঠিত মসজিদ। শনিবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এ জাদুঘর। শিকারপুরের তারা মন্দির : শহর থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরে সুগন্ধা নদীর তীরে শিকারপুর গ্রামে অবস্থিত তারা মন্দির। দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর চলতি শতকের গোড়ার দিকে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়। মাহিলারা সরকার মঠ : জেলার উজিরপুর উপজেলার মাহিলারা এলাকায় প্রাচীন একটি স্থাপনা সরকার মঠ। আটকোণাকৃতির এ মঠটি প্রায় ২০.২১ মিটার উঁচু। পুরো মঠের গায়ে নানান অলঙ্করণে শোভিত। জানা যায়, অষ্টাদশ শতকে নবাব আলীবদর্ী খাঁর সময়ে সরকার রূপরাম দাসগুপ্ত এটি নির্মাণ করেন। কসবা মসজিদ : জেলার গৌরনদী থানার রামসিদ্ধি গ্রামে অবস্থিত প্রচীন স্থাপনা কসবা মসজিদ। বর্গাকারে নির্মিত এ মসজিদের প্রত্যেক পাশের দৈর্ঘ্য ১৬.৯৬ মিটার। প্রাচীরগুলি বেশ প্রশস্ত। এর চার কোণে চারটি ছোট আকৃতির মিনার আছে। মসজিদের সামনের দেয়ালে তিনটি এবং উত্তর দেয়ালে একটি করে প্রবেশপথ আছে। প্রবেশপথগুলো পোড়ামাটির অলঙ্করণে শোভিত। মসজিদের উপরে আছে নয়টি গম্বুজ। ধারণা করা হয়, খানজাহানের সময়ে মসজিদটি নির্মিত। কিভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে নদী ও সড়কপথে বরিশাল যাওয়া যায়। ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন রাতে ছাড়ে এমভি সুন্দরবন (০১৭১৩-০৩২০৮৯, ০১৭১৮৬৬৪৭০০), এমভি সুরভী (০১৭১৩-৪৫০১৪৫, ০১৭১১-৩৩২০৩২), এমভি দ্বীপরাজ (০১৭২৭৭০০৭৭৭), এমভি কীর্তনখোলা (০১৭২৭৭০০৭৭৭), এমভি কালাম খান, এমভি পারাবাত (০১৭১১৩৩০৬৪২, ০১৭১১৩৪৪৭৪৭) ইত্যাদি। এসব লঞ্চে প্রথম শ্রেণীর একক কেবিন ৪৫০-৫৫০ টাকা, দ্বৈত কেবিন ৯০০-১০০০ টাকা। ডেকে জনপ্রতি ভাড়া ২০০-২৫০ টাকা। এছাড়া ঢাকার গাবতলী থেকে সাকুরা পরিবহন (০২-৮০১৪৭০২), সুরভী পরিবহন, দ্রুতি পরিবহন (০২-৯০০২৯৮৯), শ্যামলী পরিবহন (০২-৯১৪১০৪৭), হানিফ এন্টারপ্রাইজ (০২-৯১৩৫০১৮) ইত্যাদি বাস সরাসরি বরিশালে যায়। ভাড়া ২৫০-৩০০ টাকা। কোথায় থাকবেন : বরিশাল শহরে থাকার জন্য ভালো মানের হোটেল হলো_হোটেল এ্যাথেনা (০১৭১২-২৬১৬৩৩, ভিভিআইপি কক্ষ ২৫০০ টাকা, ভিআইপি ১৮০০ টাকা, দ্বৈত কক্ষ ১১০০ টাকা এবং একক কক্ষ ৯০০ টাকা)। হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনাল (০১৭১৪২-০০৭০৭০, এসি একক কক্ষ ৭০০ টাকা, এসি দ্বৈত কক্ষ ১০০০ টাকা, ভিআইপি একক কক্ষ ১৫০০ টাকা, ভিআইপি দ্বৈত কক্ষ ২৫০০ টাকা, সাধারণ একক কক্ষ ৩৫০ টাকা, সাধারণ দ্বৈত কক্ষ ৪৫০ টাকা।

বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৩

ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশালঃ ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বরিশাল আমার গর্ব


কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত ধান-নদী খালের অপূর্ব সমাহার বরিশাল। বরিশাল দক্ষিণ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা এবং বরিশাল বিভাগের সদর দপ্তর। দেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র পলি জমে সৃষ্ট কয়েকটি দ্বীপ বরিশাল। এ অঞ্চল বা এর অংশ বিশেষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সময়ে পরিচিত ছিল। প্রাচীন নাম বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ। পাঙ্গালা, সাগরদ্বীপ, চন্দ্রদ্বীপ, বঙ্গাল প্রভৃতি ছত্রিশটি নামার পরিচয় পাওয়া যায়। চন্দ্রদ্বীপ কখনো পরগণা, কখনো বা রাজ্য হিসেবে সুপরিচিত ছিলো। চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত এ অঞ্চল চন্দ্রদ্বীপ নামে প্রসিদ্ধ লাভ করে। দক্ষিণ পূর্ব বাংলায় মুসলিম আধিপত্য বিস্তারকালে দনুজমর্দন কর্তৃক চন্দ্রদ্বীপ নামে এ স্বাধীন রাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাচীনকাল থেকেই নদী ভাঙ্গন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলা করে বেঁচে থাকা এ অঞ্চলের মানুষের পেশা কৃষি ও মৎস্য শিকার। গঙ্গার মোহনায় অবস্থিত চন্দ্রদ্বীপে লোকবসতি কবে শুরু হয়েছে তার সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রাচীন পুঁথি থেকে ধারণা পাওয়া যায় বাকলা-চন্দ্রদ্বীপের জন্ম ৪ হাজার বছর পূর্বে। প্রাচীনকালে এই দ্বীপে ছিল অসংখ্য নদী-নালা।

বরিশাল জেলা তথ্য বাতায়নে আপনাকে স্বাগতম


বরিশাল দক্ষিণ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা এবং বরিশাল বিভাগের সদর দপ্তর। সংক্ষেপে এর সীমারেখা হচ্ছে উত্তরে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ, পশ্চিমে গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি, দক্ষিণে বরগুনা ও পটুয়াখালী এবং পূর্বে ভোলা ও লক্ষ্মীপুর। কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত এ শহরের পুরাতন নাম চন্দ্রদ্বীপ। দেশের খাদ্যশস্য ও মৎস্য উৎপাদনের অন্যতম মূল উৎস বরিশাল। একে বাংলার ভেনিস বলা হয়। বরিশাল দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর। বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বরিশাল এক অসাধারণ স্থান দখল করে আছে। বাঙালির অনেক কীর্তি আর কৃতিত্বের সাথে জড়িয়ে আছে বরিশালের নাম। মহান নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, কবি সুফিয়া কামাল, কবি জীবনানন্দ দাশ, চারণকবি মুকুন্দ দাসসহ আরো অনেক কীর্তিমান জন্ম নিয়েছেন বরিশালে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে বরিশাল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। এ জেলার প্রশাসন জেলাবাসীকে অবিরত সেবা দিয়ে আসছে এবং জেলার পর্যটন ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্ভাব্যতা সমগ্র বিশ্বে তুলে ধরার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

শনিবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৩

জীবনানন্দ দাশ

জীবনানন্দ দাশের সুবিখ্যাত প্রতিকৃতি ছদ্মনাম 'শ্রী', 'কালপুরুষ' জীবিকা কবি, ঔপন্যাসিক,গল্পকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, গীতিকার, সময়কাল বঙ্গীয় নবজাগরণ উল্লেখযোগ্য লেখনী ঝরা পালক, রূপসী বাংলা, ধূসর পাণ্ডুলিপি, মহাপৃথিবী, বনলতা সেন উল্লেখযোগ্য পুরস্কার রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার সঙ্গী লাবণ্য দেবী সন্তান মঞ্জুশ্রী, সমরানন্দ Influences[দেখাও] * কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কুসুমকুমারী দাশ Influenced[দেখাও] * বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের বাংলা কাব্যধারা জীবনানন্দ দাশ (জন্ম: ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯, বরিশাল - মৃত্যু: ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪, বঙ্গাব্দ: ৬ ফাল্গুন, ১৩০৫ - ৫ কার্তিক, ১৩৬১) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাংলা কবি। তিনি বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃতদের মধ্যে অগ্রগণ্য। মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ ধাপে তিনি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন এবং ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে যখন তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছিল ততদিনে তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম কবিতে পরিণত হয়েছেন। তিনি প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশ করেছেন। তবে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে অকাল মৃত্যুর আগে তিনি নিভৃতে ১৪টি উপন্যাস এবং ১০৮টি ছোটগল্প রচনা গ্রন্থ করেছেন যার একটিও তিনি জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি। তাঁর জীবন কেটেছে চরম দারিদ্রের মধ্যে। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধকাল অনপনেয়ভাবে বাংলা কবিতায় তাঁর প্রভাব মুদ্রিত হয়েছে। রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসাবে তিনি সর্বসাধারণ্যে স্বীকৃত। পরিচ্ছেদসমূহ [আড়ালে রাখো] * ১ জীবন বৃত্তান্ত o ১.১ শৈশব o ১.২ কলকাতা জীবন: প্রথম পর্ব o ১.৩ সাহিত্যচর্চা ও জীবনসংগ্রাম o ১.৪ বরিশালে প্রত্যাবর্তন o ১.৫ কলকাতা জীবন: চূড়ান্ত পর্ব * ২ কর্মজীবন * ৩ সাহিত্যিক জীবন * ৪ স্বীকৃতি ও সমালোচনা * ৫ পুরস্কার * ৬ মৃত্যু * ৭ গ্রন্থতালিকা o ৭.১ কাব্যগ্রন্থ o ৭.২ প্রবন্ধগ্রন্থ o ৭.৩ উপন্যাস o ৭.৪ গল্পগ্রন্থ o ৭.৫ পত্রসংকলন * ৮ তথ্যসূত্র * ৯ বহিঃসংযোগ [সম্পাদনা] জীবন বৃত্তান্ত [সম্পাদনা] শৈশব জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের জেলাশহর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণা নিবাসী। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৯৩৮-৮৫) বিক্রমপুর থেকে স্থানান্তরক্রমে বরিশালে নিবাস গাড়েন।[১] সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। তিনি বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর মানবহিতৈষী কাজের জন্যে সমাদৃত ছিলেন।[২] জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত সর্বানন্দের দ্বিতীয় পুত্র। সত্যানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৬৩-১৯৪২) ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। জীবনানন্দের মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি, তাঁর সুপরিচিত কবিতা আদর্শ ছেলে (আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে) আজও শিশুশ্রেণীর পাঠ্য। জীবনানন্দ ছিলেন পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান; তার ডাকনাম ছিল মিলু। তার ভাই অশোকানন্দ দাশ ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে এবং বোন সুচরিতা দাশ ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কম বয়সে স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিরোধী ছিলেন ব'লে বাড়িতে মায়ের কাছেই মিলুর বাল্যশিক্ষার সূত্রপাত। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পিতার কণ্ঠে উপনিষদ আবৃত্তি ও মায়ের গান শুনতেন। লাজুক স্বভাবের হলেও তার খেলাধুলা, ভ্রমণ ও সাঁতারের অভ্যাস ছিল। ছেলেবেলায় একবার কঠিন অসুখে পড়েন। স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্যে মাতা ও মাতামহ হাসির গানের কবি চন্দ্রনাথের সাথে লক্ষ্মৌ, আগ্রা, দিল্লী প্রভৃতি স্থান ভ্রমণ করেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে আট বছরের মিলুকে ব্রজমোহন স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করানো হয়। স্কুলে থাকাকালীন সময়েই তার বাংলা ও ইংরেজিতে রচনার সূচনা হয়, এছাড়াও ছবি আঁকার দিকেও তার ঝোঁক ছিল। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রজমোহন বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগসহ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। দু'বছর পর ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় পূর্বের ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটান ; অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার উদ্দেশ্যে বরিশাল ত্যাগ করেন। [সম্পাদনা] কলকাতা জীবন: প্রথম পর্ব জীবনানন্দ কলকাতার নামকরা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি এ কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ. পাশ করেন। ওই বছরেই ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় তার প্রথম কবিতা ছাপা হয়। কবিতাটির নাম ছিল বর্ষ আবাহন। কবিতাটিতে কবির নাম ছাপা হয়নি, কেবল সম্মানসূচক শ্রী কথাটি লেখা ছিল। তবে পত্রিকার বর্ষশেষের নির্ঘণ্ট সূচিতে তার পূর্ণ নাম ছাপা হয়: শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত, বিএ। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে দ্বিতীয় বিভাগসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কিছুকাল আইনশাস্ত্রেও অধ্যয়ন করেন। সে সময়ে তিনি হ্যারিসন রোডের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে থাকতেন।[৩] তবে পরীক্ষার ঠিক আগেই তিনি ব্যাসিলারি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন, যা তার প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত করে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে জীবনানন্দ কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন ছেড়ে দেন। [সম্পাদনা] সাহিত্যচর্চা ও জীবনসংগ্রাম জীবনানন্দের সাহিত্যিক জীবন বিকশিত হতে শুরু করে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৫ এর জুনে মৃত্যুবরণ করলে জীবনানন্দ তার স্মরণে 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' নামক একটি কবিতা রচনা করেন, যা বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটি পরবর্তীতে তার প্রথম কাব্য সংকলন ঝরা পালকে স্থান করে নেয়। কবিতাটি পড়ে কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন, "এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোন প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামে রচনা"। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দেই তার প্রথম প্রবন্ধ স্বর্গীয় কালীমোহন দাশের শ্রাদ্ধবাসরে প্রবন্ধটি ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার পরপর তিনটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ঐ বছরেই কল্লোল পত্রিকায় 'নীলিমা' কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা অনেক তরুণ কাব্যসরিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ধীরে ধীরে কলকাতা, ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে থাকে; যার মধ্যে রয়েছে সে সময়কার সুবিখ্যাত পত্রিকা কল্লোল, কালি ও কলম, প্রগতি প্রভৃতি। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়। সে সময় থেকেই তিনি তার উপাধি 'দাশগুপ্তের' বদলে কেবল 'দাশ' লিখতে শুরু করেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কয়েক মাসের মাথাতেই তিনি সিটি কলেজে তার চাকরিটি হারান। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কলেজটিতে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দেয়, ফলাফলস্বরূপ কলেজটির ছাত্রভর্তির হার আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। জীবনানন্দ ছিলেন কলেজটির শিক্ষকদের মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং আর্থিক অসুবিধায় পড়ে কলেজ তাকেই চাকরিচ্যুত করে। কলকাতার সাহিত্যচক্রেও সে সময় তার কবিতা কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হয়। সে সময়কার প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস| শনিবারের চিঠি পত্রিকায় তার রচনার নির্দয় সমালোচনায় প্রবৃত্ত হন। কলকাতায় করবার মতোন কোন কাজ ছিল না বিধায় কবি ছোট্ট শহর বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে তিন মাস পরেই তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময় তিনি চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়েছিলেন। জীবনধারণের জন্যে তিনি টিউশানি করতেন এবং সাথে সাথে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সন্ধান করছিলেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে তিনি দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। বরিশালে তার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন করছিল এবং ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৯ই মে তারিখে তিনি লাবণ্য দেবীর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ে হয়েছিলো ঢাকায়, ব্রাহ্ম সমাজের রামমোহন লাইব্রেরিতে।[৩] বিয়ের পর আর দিল্লিতে ফিরে যাননি তিনি, ফলে সেখানকার চাকরিটি খোয়ান। এরপর প্রায় বছর পাঁচেক সময় জীবনানন্দ কর্মহীন অবস্থায় ছিলেন। মাঝে কিছু দিন ইনশিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন; ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে অর্থ ধার করে ব্যবসার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু কোনটাই স্থায়ী হয়নি। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কবির প্রথম সন্তান মঞ্জুশ্রীর জন্ম হয়। প্রায় সে সময়েই তার ক্যাম্পে কবিতাটি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং সাথে সাথে তা কলকাতার সাহিত্যসমাজে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়। কবিতাটির আপাত বিষয়বস্তু ছিল জোছনা রাতে হরিণ শিকার। অনেকেই এই কবিতাটি পাঠ করে তা অশ্লীল হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি তার বেকারত্ব, সংগ্রাম ও হতাশার এই সময়কালে বেশ কিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনা করেছিলেন;- তবে তার জীবদ্দশায় সেগুলো প্রকাশিত করেন নি। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি একগুচ্ছ গীতিকবিতা রচনা করেন যা পরবর্তীতে তার রূপসী বাংলা কাব্যের প্রধান অংশ নির্মাণ করে। জীবনানন্দ এ কবিতাগুলো প্রকাশ করেননি এবং তার মৃত্যুর পর কবিতাগুলো একত্র করে ১৯৫৭ সালে রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। [সম্পাদনা] বরিশালে প্রত্যাবর্তন ১৯৩৫ সালে জীবনানন্দ তার পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্রজমোহন কলেজে ফিরে যান, যা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। তিনি সেখানকার ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সে সময়ে কলকাতায় বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং সমর সেন একটি আনকোড়া নতুন কবিতাপত্রিকা বের করার তোড়জোড় করছিলেন, যার নাম দেয়া হয় কবিতা। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যাতেই জীবনানন্দের একটি কবিতা স্থান করে নেয়, যার নাম ছিল 'মৃত্যুর আগে'। কবিতাটি পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেবকে লেখা একটি চিঠিতে মন্তব্য করেন কবিতাটি 'চিত্ররূপময়'। কবিতা পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতে (পৌষ ১৩৪২ সংখ্যা; ডিসে ১৯৩৪/জানু ১৯৩৫) তার কিংবদন্তিতুল্য বনলতা সেন কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এই ১৮ লাইনের কবিতাটি বর্তমানে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতার অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। পরের বছর জীবনানন্দের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পান্ডুলিপি প্রকাশিত হয়। জীবনানন্দ এর মধ্যেই বরিশালে সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯৩৬ এর নভেম্বরে তার পুত্র সমরানন্দের জন্ম হয়। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতা সংকলন সম্পাদনা করেন, যার নাম ছিল বাংলা কাব্য পরিচয় এবং এতে জীবনানন্দের মৃত্যুর আগে কবিতাটি স্থান পায়। ১৯৩৯ সালে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয় আবু সয়ীদ আইয়ুব ও হিরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়; এতে জীবনানন্দের চারটি কবিতা - পাখিরা, শকুন, বনলতা সেন এবং নগ্ন নির্জন হাত অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪২ সালে কবির পিতৃবিয়োগ হয় এবং ঐ বছরেই তার তৃতীয় কবিতাগ্রন্থ বনলতা সেন প্রকাশিত হয়। বইটি বুদ্ধদেব বসুর কবিতা-ভবন হতে 'এক পয়সায় একটি' সিরিজের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং এর পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ষোল। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন জীবনানন্দের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এবং তার সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায় জীবনানন্দের বহু সংখ্যক কবিতা ছাপা হয়। ১৯৪৪ সালে তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ মহাপৃথিবী প্রকাশিত হয়। এর আগের তিনটি কাব্যগ্রন্থ তাকে নিজের পয়সায় প্রকাশ করতে হয়েছিল, তবে মহাপৃথিবীর জন্যে প্রকাশক পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে প্রকাশিত এই কবিতাগুচ্ছে যুদ্ধের ছাপ স্পষ্ট। [সম্পাদনা] কলকাতা জীবন: চূড়ান্ত পর্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে। জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের জন্যে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানান। এর ফলে বাংলা দ্বিখন্ডিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে, কারণ এর পূর্ব অংশ ছিল মুসলমান সংখ্যাপ্রধান আর পশ্চিমাংশে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগুরু। ১৯৪৭ এর দেশভাগ পূর্ববর্তী ঐ সময়টিতে বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিভৎসরূপে দেখা দেয়। জীবনানন্দ সব সময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন। কলকাতায় যখন ১৯৪৬ সালে আবার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে কবি তখন লেখেন ১৯৪৬-৪৭ কবিতাটি। দেশবিভাগের কিছু আগে তিনি বি.এম. কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতায় চলে যান। পরে তিনি আর পূর্ববঙ্গে ফিরে যাননি। কলকাতায় তিনি দৈনিক স্বরাজ পত্রিকার রোববারের সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনা করেন কয়েক মাস। ১৯৪৮ খৃস্টাব্দে তিনি দু'টি উপন্যাস লিখেছিলেন - মাল্যবান ও সুতীর্থ, তবে আগেরগুলোর মতো ও দুটিও প্রকাশ করেননি। এ বছরের ডিসেম্বরে তাঁর পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ সাতটি তারার তিমির প্রকাশিত হয়। একই মাসে কলকাতায় তার মাতা কুসুমকুমারী দাশের জীবনাবসান ঘটে। ইতোমধ্যেই জীবনানন্দ কলকাতার সাহিত্যিক সমাজে নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন। তিনি 'সমকালীন সাহিত্যকেন্দ্র' নামে একটি সংস্থার সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এই সংস্থার মুখপত্র দ্বন্দ্ব পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক নিযুক্ত হন। মাঝে তিনি কিছুকাল খড়গপুর কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৫২ খৃস্টাব্দে তাঁর জনপ্রিয় কবিতার বই বনলতা সেন সিগনেট প্রেস কর্তৃক পরিবর্ধিত আকারে প্রকাশিত হয়। বইটি পাঠকানুকূল্য লাভ করে এবং নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন-কর্তৃক ঘোষিত "রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার" জয় করে। ১৯৫৪ খৃস্টাব্দের মে মাসে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা। বইটি ১৯৫৫ খৃস্টাব্দে ভারত সরকারের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করে। [সম্পাদনা] কর্মজীবন অধ্যাপনার কাজে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা ও সমাপ্তি। এমএ পাসের পর কলকাতায় কলেজের বোর্ডিংয়ে থাকার প্রয়োজন হলে তিনি আইন পড়া শুরু করেন। এ সময় তিনি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত সিটি কলেজে টিউটর হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯২৮-এ সরস্বতী পূজা নিয়ে গোলযোগ শুরু হলে অন্যান্য কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাঁকেও ছাঁটাই করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। জীবনের শেষভাগে কিছুদিনের জন্য কলকাতার একটি দৈনিক পত্রিকা স্বরাজ-এর সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনায় নিযুক্ত ছিলেন। অধ্যাপনা করেছেন বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, যার মধ্যে আছে সিটি কলেজ, কলকাতা (১৯২২-১৯২৮), বাগেরহাট কলেজ, খুলনা (১৯২৯); রামযশ কলেজ, দিল্লী (১৯৩০-১৯৩১), ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল (১৯৩৫-১৯৪৮), খড়গপুর কলেজ (১৯৫১-১৯৫২), বড়িশা কলেজ (অধুনা 'বিবেকানন্দ কলেজ', কলকাতা) (১৯৫৩) এবং হাওড়া গার্লস কলেজ, কলকাতা, (১৯৫৩-১৯৫৪)। তার কর্মজীবন আদৌ মসৃণ ছিল না। চাকুরী তথা জীবিকার অভাব তাকে আমৃত্যু কষ্ট দিয়েছে। একটি চাকুরির জন্য হন্যে হয়ে তিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। স্ত্রী লাবণ্য দাশ স্কুলে শিক্ষকতা করে জীবিকার অভাব কিছুটা পুষিয়েছেন। ১৯৫৪ সালে অকাল মৃত্যুর সময় তিনি হাওড়া গার্লস কলেজ কর্মরত ছিলেন। দুই দফা দীর্ঘ বেকার জীবনে তিনি ইন্সুরেন্স কোম্পানীর এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন এবং প্রধানত গৃহশিক্ষকতা করে সংসার চালিয়েছেন। এছাড়া ব্যবসার চেষ্টাও করেছিলেন বছরখানেক। দারিদ্র্য এবং অনটন ছিল তার কর্মজীবনের ছায়াসঙ্গী। [সম্পাদনা] সাহিত্যিক জীবন সম্ভবতঃ মা কুসুমকুমারী দেবীর প্রভাবেই ছেলেবেলায় পদ্য লিখতে শুরু করেন তিনি। ১৯১৯ সালে তাঁর লেখা একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা। কবিতাটির নাম বর্ষা আবাহন। এটি ব্রহ্মবাদী পত্রিকার ১৩২৬ সনের বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। তখন তিনি শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত নামে লিখতেন। ১৯২৭ সাল থেকে তিনি জীবনানন্দ দাশ নামে লিখতে শুরু করেন। ১৬ জুন ১৯২৫ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এর লোকান্তর হলে তিনি 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন যা বংগবাণী পত্রিকার ১৩৩২ সনের শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তবে দীনেশরঞ্জন দাস সম্পাদিত কল্লোল পত্রিকায় ১৩৩২ (১৯২৬ খ্রি.) ফাল্গুন সংখ্যায় তাঁর নীলিমা শীর্ষক কবিতাটি প্রকাশিত হলে আধুনিক বাংলা কবিতার ভুবনে তার অন্নপ্রাশন হয়। জীবদ্দশায় তাঁর ৭টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশিত ঝরাপালক শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে তাঁর প্রকৃত কবিত্বশক্তি ফুটে ওঠেনি, বরং এতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রকট প্রভাব প্রত্যক্ষ হয়। তবে দ্রুত তিনি স্বকীয়তা অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘ ব্যবধানে প্রকাশিত দ্বিতীয় কাব্য সংকলন ধূসর পান্ডুলিপি-তে তাঁর স্বকীয় কাব্য কৌশল পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের ভূবনে তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। শেষের দিককার কবিতায় অর্থনির্মলতার অভাব ছিল। সাতটি তারার তিমির প্রকাশিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুবোর্ধ্যতার অভিযোগ ওঠে। নিজ কবিতার অপমূল্যায়ন নিয়ে জীবনানন্দ খুব ভাবিত ছিলেন। তিনি নিজেই স্বীয় রচনার অর্থায়ন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন যদিও শেষাবধি তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে কবি নিজেই নিজ রচনার কড়া সমালোচক ছিলেন। তাই সাড়ে আট শত কবিতার বেশী কবিতা লিখলেও তিনি জীবদ্দশায় মাত্র ২৬২টি কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও কাব্যসংকলনে প্রকাশ করতে দিয়েছিলেন। এমনকি রূপসী বাংলার সম্পূর্ণ প্রস্তুত পাণ্ডুলিপি তোড়ঙ্গে মজুদ থাকলেও তা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি জীবনানন্দ দাশ। তবে তিনি এ কাব্যগ্রন্থটির নাম দিয়েছিলেন বাংলার ত্রস্ত নীলিমা যা তার মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত এবং রূপসী বাংলা প্রচ্ছদনামে প্রকাশিত হয়। আরেকটি পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয় মৃত্যু পরবর্তীকালে যা বেলা অবেলা কালবেলা নামে প্রকাশিত হয়। জীবদ্দশায় তার একমাত্র পরিচয় ছিল কবি। অর্থের প্রয়োজনে তিনি কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন ও প্রকাশ করেছিলেন। তবে নিভৃতে গল্প এবং উপন্যাস লিখেছিলেন প্রচুর যার একটিও প্রকাশের ব্যবস্থা নেননি। এছাড়া ষাট-পয়ষট্টিরও বেশী খাতায় "লিটেরেরী নোটস" লিখেছিলেন যার অধিকাংশ এখনও (২০০৯) প্রকাশিত হয়নি। [সম্পাদনা] স্বীকৃতি ও সমালোচনা জীবদ্দশায় অসাধারণ কবি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তিনি খ্যাতি অর্জন করে উঠতে পারেননি। এর জন্য তার প্রচারবিমুখতাও দায়ী; তিনি ছিলেন বিবরবাসী মানুষ। তবে মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তিনি বাংলা ভাষায় আধুনিক কবিতার পথিকৃতদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। জীবনানন্দ দাশের জীবন এবং কবিতার উপর প্রচুর গ্রন্থ লেখা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, বাংলা ভাষায়। এর বাইরে ইংরেজিতে তার ওপর লিখেছেন ক্লিনটন বি সিলি, আ পোয়েট আর্পাট‌‌ নামের একটি গ্রন্থে। ইংরেজি ছাড়াও ফরাসিসহ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। তিনি যদিও কবি হিসেবেই সমধিক পরিচিত কিন্তু মৃত্যুর পর থেকে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ অবধি তাঁর যে বিপুল পাণ্ডুলিপিরাশি উদ্ঘাটিত হয়েছে তার মধ্যে উপন্যাসের সংখ্যা ১৪ এবং গল্পের সংখ্যা শতাধিক। [সম্পাদনা] পুরস্কার নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন ১৯৫২ খৃস্টাব্দে পরিবর্ধিত সিগনেট সংস্করণ বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি বাংলা ১৩৫৯-এর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বিবেচনায় পুরস্কৃত করা হয়। কবির মৃত্যুর পর ১৯৫৫ খৃস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪) সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার লাভ করে। [সম্পাদনা] মৃত্যু শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল, কলকাতা। ১৪ই অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দূর্ঘটনায় তিনি আহত হন। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তার শরীর দলিত হয়ে গিয়েছিল। ভেঙ্গে গিয়েছিল কণ্ঠা, ঊরু এবং পাঁজরের হাড়। গুরুতরভাবে আহত জীবনানন্দের চিৎকার শুনে ছুটে এসে নিকটস্থ চায়ের দোকানের মালিক চূণীলাল এবং অন্যান্যরা তাঁকে উদ্ধার করে।[৪] তাঁকে ভর্তি করা হয় শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। এ সময় ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ-সহ অনেক তরুণ কবি জীবনানন্দের সুচিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস [৫] এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধেই পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে এসেছিলেন এবং আহত কবির সুচিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছিলেন যদিও এতে চিকিৎসার তেমন উন্নতি কিছু হয়নি। এ সময় স্ত্রী লাবণ্য দাশকে কদাচিৎ কাছে দেখা যায়। তিনি টালিগঞ্জে সিনেমার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। জীবনানন্দের অবস্থা ক্রমশঃ জটিল হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন কবি। চিকিৎসক ও সেবিকাদের সকল প্রচেষ্টা বিফলে দিয়ে ২২শে অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে রাত্রি ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। আবদুল মান্নান সৈয়দ-সহ কেউ কেউ ধারণা করেছেন হয় আত্মহত্যা স্পৃহা ছিল দুর্ঘটনার মূল কারণ[৬]। জীবনানন্দ গবেষক ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ মনে করেন জাগতিক নিঃসহায়তা কবিকে মানসিকভাবে কাবু করেছিল এবং তাঁর জীবনস্পৃহা শূন্য করে দিয়েছিল। মৃত্যুচিন্তা কবির মাথায় দানা বেঁধেছিল। তিনি প্রায়ই ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা ভাবতেন। গত এক শত বৎসরে ট্রাম দুর্ঘটনায় কোলকাতায় মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র একটি। তিনি আর কেউ নন, কবি জীবনানন্দ দাশ। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর মতে এ সময় দুই হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে ট্রাম লাইন পার হচ্ছিলেন কবি। আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে গৃহে ফেরার সড়কে ওঠার জন্য ট্রাম লাইন পারি দেয়া খুব গ্রহণযোগ্য যুক্তি নয়। [৭] [সম্পাদনা] গ্রন্থতালিকা [সম্পাদনা] কাব্যগ্রন্থ জীবনানন্দের কাব্যগ্রন্থসমূহের প্রকাশকাল সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের একাধিক পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। নিচে কেবল প্রথম প্রকাশনার বৎসর উল্লিখিত। মৃত্যু পরবর্তী প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ তারকা চিহ্নিত। * ঝরা পালক (১৯২৭) * ধূসর পান্ডুলিপি (১৯৩৬) * বনলতা সেন (১৯৪২, কবিতাভবন সংস্করণ) * মহাপৃথিবী (১৯৪৪) * সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮) * বনলতা সেন (১৯৫২, সিগনেট প্রেস সংস্করণ) * জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪) * রূপসী বাংলা (১৯৫৭)* * বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১)* * সুদর্শনা (১৯৭৪)* * আলো পৃথিবী (১৯৮১) * * মনোবিহঙ্গম* * অপ্রকাশিত একান্ন (১৯৯৯) * [সম্পাদনা] প্রবন্ধগ্রন্থ * কবিতার কথা (১৯৫৫) * জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সমগ্র (১৯৯০, সম্পাদকঃ ফয়জুল লতিফ চৌধুরী)* [সম্পাদনা] উপন্যাস * মাল্যবান (১৯৭৩)* * সুতীর্থ (১৯৭৭) * চারজন (২০০৪: সম্পাদকঃ ভূমেন্দ্র গুহ ও ফয়সাল শাহরিয়ার)* [সম্পাদনা] গল্পগ্রন্থ * জীবনানন্দ দাশের গল্প (১৯৭২, সম্পাদনা: সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী) * জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৯, সম্পাদনা: আবদুল মান্নান সৈয়দ) [সম্পাদনা] পত্রসংকলন * জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী (বাংলা ১৩৮৫, সম্পাদকঃ দীপেনকুমার রায়) * জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী (১৯৮৬, সম্পাদকঃ আবদুল মান্নান সৈয়দ) ) [সম্পাদনা] তথ্যসূত্র 1. ↑ Das, P. 2003, p. 1 2. ↑ Das, P. 2003, p. 6 3. ↑ ৩.০ ৩.১ আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশের জীবনপঞ্জি ISBN 984-415-054-X. 4. ↑ ক্লিনটন বি সিলি লিখিত আ পোয়েট আপার্ট 5. ↑ স্মরণ করা যেতে পারে যে শনিবারের চিঠি-র সম্পাদক সজনীকান্ত দাশ দীর্ঘকাল বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে জীবনানন্দের কবিতার সমালোচনা করেছিলেন। 6. ↑ হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত আধুনিক বাঙলা কবিতা ISBN 984-901-205-1. 7. ↑ জীবনানন্দের মৃত্যু - ফয়জুল লতিফ চৌধুরী [সম্পাদনা] বহিঃসংযোগ * জীবনানন্দ দাশ সংক্রান্ত অন্তর্জাল পাতা * শম্ভু মিত্রের গলায় বোধ কবিতাটির আবৃত্তি * Search.com.bd * জীবনানন্দ দাশ: রবীন্দ্রোত্তর বাঙালি কবি; রচয়িতা - দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় * Britannica.com * TribuneIndia.com * Vadamsbooks.com * Wetpaint.com [আড়াল করো] * দে * আ * স জীবনানন্দ দাশের জীবন ও কর্ম কাব্য সংকলন ঝরা পালক · ধূসর পাণ্ডুলিপি · বনলতা সেন · মহাপৃথিবী · সাতটি তারার তিমির · শ্রেষ্ঠ কবিতা · রূপসী বাংলা · বেলা অবেলা কালবেলা · জীবনানন্দ দাশ - কাব্য সংগ্রহ সংগৃহীত প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতা সংগ্রহ · জীবনানন্দ দাশের কাব্য-সংগ্রহ গদ্য উপন্যাস মাল্যবান · সতীর্থ · চারজন · পূর্ণিমা · কল্যাণী · নিরুপম যাত্রা · জলপাইহাটি · বাঁশমতির উপাখ্যান ছোটো গল্প "জীবনানন্দ দাশের গল্প - গল্প সংকলন" প্রবন্ধ কবিতার কথা · সম্পর্কিত নিবন্ধ সমকালীন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু · অজিত কুমার দত্ত · সজনীকান্ত দাস · সুধীন্দ্রনাথ দত্ত · প্রেমেন্দ্র মিত্র · সমর সেন · সঞ্জয় ভট্টাচার্য · আবু সয়ীদ আইয়ুব · অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত সাহিত্য পত্রিকা ব্রাহ্মবাদী · কল্লোল · কালি-কলম · পরিচয় · শনিবারের চিঠি · কবিতা · প্রগতি জীবনানন্দ গবেষক ও অনুবাদক আবদুল মান্নান সৈয়দ · দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় · চিদানন্দ দাশগুপ্ত · ক্লিনটন বি. সিলি · ফয়জুল লতিফ চৌধুরি · প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় · আবুল হাসান শাহরিয়ার · ভূমেন্দ্র গুহ · ফকরুল আলম · জো উইন্টার · অনুপম সেন স্থান বরিশাল · ব্রজমোহন কলেজ · কলকাতা

আবদুর রহমান বিশ্বাস

আবদুর রহমান বিশ্বাস বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বরিশালের শায়েস্তাবাদ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। [সম্পাদনা] শিক্ষা ও কর্মজীবন আবদুর রহমান বিশ্বাস স্কুল ও কলেজ জীবন বরিশালে কাটে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (সম্মান) ও ইতিহাস এবং আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। প্রথমে তিনি স্থানিয় সমবায় ব্যাঙ্কের সভাপতি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষাবিস্তারেরে উদ্দেশ্যে তিনি কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এই কাজের জন্য সরকার ১৯৫৮ সালে তাকে সেচ্ছাসেবি সমাজ কর্মি হিসেবে স্বীকৃতি দান করে। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত তিনি সংসদ সচিব হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি জাতিসংঘের ২২তম সাধারণ সভায় অংশ করেন। ১৯৭৪ ও ১৯৭৬ সালে তিনি বরিশাল বার আসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯-৮০ সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় পাট মন্ত্রী ছিলেন এবং ১৯৮১-৮২ সালে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস্‌ সাত্তারের মন্ত্রী সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯১ এর ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ৪ এপ্রিল ১৯৯১ সালে তিনি সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। দেশে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা চালু হবার পর ১৯৯১ এর ৮ অক্টোবর দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি থাকা কালীন তিনি দেশের এক সামরিক ক্যু প্রতিহত করেন। ১৯৯৬ সালের ৮ অক্টোবর তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেয়াদ শেষ হয়।

ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর উপর ভিত্তি করে মোট জনসংখ্যা এবং উপাসনালয় সংখ্যা

* বরিশালের মোট জনসংখ্যার ৯০.৬৪% মুসলিম, ৮.৩৮% হিন্দু, খ্রিষ্টান ০.৯৮% * মসজিদ এর সংখ্যা ১৫০, চার্চ এর সংখ্যা ৫, মন্দিরের সংখ্যা ২০০-র উপর

বরিশাল বিভাগ এর জনসংখ্যা

বরিশাল মেট্রোপলিটন শহরে বসবাসরত জনসংখ্যা ২১০,৩৭৪ জন। মহানগরীয় অঞ্চলে বসবাসরত জনসংখ্যা ৩,৮৫৩,০৯৩ জন। মোট জনসংখ্যার ৫৩.২৮% পুরুষ এবং নারী ৪৬.৭২%।